India National Anthem : ‘জনগণমন আদতে রাজপ্রশস্তি’, হয়েছিল বিতর্ক, কীভাবে জবাব দেন রবীন্দ্রনাথ? জানুন জাতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস
আজ ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করছে ভারত। প্রতিটি মঞ্চে গাওয়া হচ্ছে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’। কিন্তু ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’-র ইতিহাস কী। কবে এই গান লেখা হয়। কবে এই গান জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।

১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের শুরুতে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে গানটি প্রথম পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে এ গান রচনা করেন , তা অবশ্য জানা যায় না।

পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকারের লেখা রবীন্দ্রগানের অন্তরালে বইটি থেকে জানা যায়, ‘জনগণমন’-র গানটির মূল পাণ্ডুলিপির সন্ধান সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ১৯১১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে গানটির প্রথম প্রকাশ্য সমবেত পরিবেশন করা হয়। ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার গ্রীয়ার পার্কে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ছাব্বিশতম অধিবেশনে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে জনগণমন অধিনায়ক গানটি সমবেতকণ্ঠে পরিবেশন করেন।

সেই বছরই দিল্লিতে পঞ্চম জর্জ ভারতের জন্য কিছু রাজকীয় সাহায্য ও সুবিধা দানের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯০৫ সালে আনা বঙ্গভঙ্গের আদেশটিকে সরকারি ভাবে রদ করা। তো, কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর উদ্বোধনী সঙ্গীতটি পরিবেশনের পর কংগ্রেস নেতারা পঞ্চম জর্জ ও তাঁর স্ত্রীকে সৌজন্য জানান, তাঁকে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য কৃতজ্ঞতা ও জানান। এই বিষয়টিকে নিয়ে ‘দ্য ইংলিশম্যান’ এবং ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় লেখে, সম্রাটকে তুষ্ট করতেই রবীন্দ্রনাথ ওই গান রচনা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের সমালোচকেরা দাবি করেন, গানটি নাকি ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের প্রশস্তি করে লেখা হয়েছিল। সেই সময় বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার এবং সম্রাটের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আবহও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতেই ‘জনগণমন’-কে রাজপ্রশস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা শুরু হয়। তাই নিয়ে বড় বিতর্ক বাঁধে।

এই ব্যাখ্যায় স্বাভাবিকভাবে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট আঘাত পান। তাঁর গানের ‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ কোনও ব্রিটিশ সম্রাট নন, এই বিষয়টি তিনি পরবর্তীতে স্পষ্ট করে দেন। রবীন্দ্রনাথ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার মাঘ ১৩১৮ সংখ্যায় গানটি ‘ভারতবিধাতা’ শিরোনামে ছাপিয়ে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

পরে পুলিনবিহারী সেনকে তিনি লেখেন, ”আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয়ঘোষণা করেছি, পতনঅভ্যুদয়বন্ধুর পন্থায় যুগযুগধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথী, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই কোনোক্রমেই হতে পারেন না সেকথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন। কেননা তাঁর ভক্তি যতই প্রবল থাক বুদ্ধির অভাব ছিল না।’

১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও ‘জনগণমন’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এটি ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।

রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘জনগণমন’- র ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। ১৯১৯ সালে মদনপল্লীতে থাকার সময় তিনি গানটি ইংরেজিতে ‘The Morning Song of India’ অনুবাদ করেন । রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘জনগণমন’ মূলত পাঁচটি স্তবকের দীর্ঘ রচনা। তবে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয় প্রথম স্তবকটি।

‘জনগণমন’-এর জনপ্রিয়তা শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৪৩ সালের ৫ জুলাই আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি অনুষ্ঠানে গানটি জাতীয় স্ঙ্গীত হিসেবে পরিবেশিত হয়েছিল । নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্যোগে গানটির হিন্দি রূপও তৈরি করা হয়। ফলে স্বাধীনতার আন্দোলনের পরিসরেও গানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
Published at : 15 Aug 2026 04:46 PM (IST)
